বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ/বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ(৬৫০-১২০০)

⏺️প্রাচীন যুগঃ
প্রাচীন যুগের শুরু নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ আছে।
➡️ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র মতে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ব্যপ্তিকাল ছিল ৬৫০খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

➡️ডক্টর সুনীতিকুমারের মতে এর সময়কাল ৯৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ।

⏺️সাহিত্যকর্মঃ
প্রাচীন যুগে বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের একমাত্র ও আদিতম নিদর্শন হল চর্যাপদ। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত চর্যা পদাবলি ছিল সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনসংগীত বা গানের সংকলন।এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল বৌদ্ধ ধর্মের সাধন প্রণালী ও দর্শন তত্ত্ব।আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকগণ বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে চর্যার ভাষা প্রকৃতপক্ষে হাজার বছর আগের বাংলা ভাষা। সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্র এই পদগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে। সাহিত্যমূল্যের বিচারে কয়েকটি পদ কালজয়ী।এটি আদি যুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন।

⏺️আবিষ্কারঃ
⏺️চর্যাপদ
অনেক প্রাচীন সাহিত্যকর্ম হলেও এটির আবিষ্কার খুব বেশিদিন আগের কথা না। ১৯০৭ খ্রীস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থশালা “রয়েল লাইব্রেরি” থেকে চর্যার একটি খণ্ডিত পুঁথি উদ্ধার করেন। মূলত ১৮৮২ সালে রাজা রাজেদ্র লাল মিত্র “Sanskrit Buddhist Literature in Nepal” গ্রন্থে চর্যাপদের অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন। আর সেই সূত্র ধরে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদ আবিষ্কারে উদ্দীপ্ত হন। চর্যাপদের সাথে ‘ডাকার্ণব’ এবং ‘দোহাকোষ’ নামে আরো দুটি বই নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে আবিষ্কৃত হয়। ১৯১৬ সালে সবগুলো বই একসাথে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায়  বৌদ্ধগান এবং দোহা’ নামে প্রকাশ করেন..পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে বাংলা ১৩২৩ বঙ্গাব্দ কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য বা কবিতা সংকলন চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন..ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে ১৯০৭ সালে ‘চর্যাচর্য বিনিশ্চয়’ নামক পুথিটি আবিষ্কার করেন।এটি প্রকাশিত হবার পর পালি সংস্কৃত সহ বিভিন্ন ভাষাবিদ রা চর্যাপদকে নিজ নিজ ভাষার আদি নিদর্শন বলে দাবী করেন।
➡️এসব দাবী মিথ্যা প্রমাণ করেন ড. সুনীতি কুমার চট্রোপাধ্যায় ১৯২৬ সালে The Origin and Development of Bengali Language গ্রন্থে চর্যাপদ এর ভাষা বিষয়ক গবেষণা করেন এবং প্রমাণ করেন চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন।
➡️১৯২৭ সালে শ্রেষ্ঠ ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের ধর্মতত্ব বিষয়ক গবেষণা করেন এবং প্রমাণ করেন যে চর্যাপদ বাংলাসাহিত্যের আদি নিদর্শন।

➡️অনেকের মতে, চর্যাপদের আদিকবি লুইপা।

⏺️বর্ণনাঃ
➡️চর্যাপদের মোট পদসংখ্যা ছিল ৫১ টি।
➡️ডঃ শহীদুল্লাহ বলেছেন ৫০টি।
➡️তবে ৫১টি সর্বজন স্বীকৃত।
এক একটি পদ সাধারণত সাধারণত ১০টি লাইন সহযোগে গঠিত।শুধুমাত্র ২১নং পদে লাইনসংখ্যা ৮টিএবং ৪৩ নং পদে লাইন সংখ্যা ১২টি।

➡️চর্যাপদের ৫১টি পদের মধ্যে সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ পাওয়া গিয়েছে,বাকি সাড়ে চারটি পদপাওয়া যায় নি।
➡️অনাবিষ্কৃত পদগুলি হল ১১,২৩,২৪,২৫,৪৮।এদের মধ্যে ২৩ তম পদের প্রথম ৬টি লাইন পাওয়া গিয়েছে বাকি ৪টি পাওয়া যায় নি।

⏺️সাহিত্যমানঃ
➡️চর্যাপদের প্রথম পদ __” কা আ তরুবর পঞ্চ বি ডাল”

➡️শবরপার একটি পদে দেখা যায় নরনারীর প্রেমের এক অপূর্ব চিত্রণ-

উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই সবরী বালী।

মোরঙ্গি পীচ্ছ পরহিণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।।

উমত সবরো পাগল শবরো মা কর গুলী গুহাডা তোহৌরি।

ণিঅ ঘরণী ণামে সহজ সুন্দারী।।

ণাণা তরুবর মৌলিল রে গঅণত লাগেলি ডালী।

একেলী সবরী এ বণ হিণ্ডই কর্ণ কুণ্ডলবজ্রধারী।।

➡️(পদ ২৮, অর্থাৎ- উঁচু পর্বতে শবরী বালিকা বাস করে। তার মাথায় ময়ূরপুচ্ছ, গলায় গুঞ্জামালিকা। নানা তরু মুকুলিত হলো। তাদের শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত হলো। শবর-শবরীর প্রেমে পাগল হলো। কামনার রঙে তাদের হৃদয় রঙিন ও উদ্দাম। শয্যা পাতা হলো। শবর-শবরী প্রেমাবেশে রাত্রিযাপন করলো।)

➡️আবার সমাজ ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দরদও আধুনিক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঢেণ্ঢণের পদে দেখা যায়– “টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী। / হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।” (পদ ৩৩, অর্থাৎ- টিলার উপর আমার ঘর, কোনও প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতেও ভাত নেই, তবু নিত্য অতিথি আসে।)

কোনও কোনও পদে নিছক দর্শনকথা অসামান্য চিত্ররূপের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।

➡️চাটিল লিখছেন– “ভবণই গহণগম্ভীরা বেগেঁ বাহী। দুআন্তে চিখিল মাঝেঁ ন ঠাহী।” (পদ ৫, অর্থাৎ- ভবনদী গহন ও গম্ভীর অর্থাৎ প্রবল বেগে প্রবহমান। তার দুইতীর কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল।)

➡️আবার কখনও বা তত্ত্বের ব্যাখ্যায় যে প্রহেলিকার অবতারণা করা হয়েছে, সেগুলিও অসামান্য সাহিত্যগুণমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। যেমন: কুক্কুরীপাদ লিখেছেন– “দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই। / রুখের তেন্তুলি কুম্ভীরে খাঅ।।” (পদ ২, অর্থাৎ- মাদী কাছিম দোহন করে দুধ পাত্রে রাখা যাচ্ছে না। গাছের তেঁতুল কুমিরে খাচ্ছে।)

➡️আবার চর্যায় মোট ৬টি প্রবাদ বাক্য পাওয়া যায়। যেমন___ “ আপনা মাংসে হরিণা বৈরি”

⏺️চর্যার কবিঃ

➡️আবিষ্কৃত পুঁথিটিতে ৫১টি চর্যায় মোট ২৪ জন সিদ্ধাচার্যের নাম পাওয়া যায়।

➡️এঁরা হলেন: লুই, কুক্কুরী, বিরুআ, গুণ্ডরী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কাম্বলাম্বর, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, শবর, আজদেব, ঢেণ্ঢণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তান্তী পা, লাড়ীডোম্বী।

➡️চর্যার পদকর্তাগণের নামের শেষে সন্মানসূচক পা যোগ করা হয় যেমনঃলুইপা,শবরপা ইত্যাদি।

➡️চর্যাপদের আদি কবি বা সিদ্ধাচার্য হিসেবে ধরা হয় লুইপাকে।
➡️কিন্তু ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন শবরপা ছিলেন লুইপার গুরু তাই চর্যার প্রাচীন কবি শবরপা-ই হবেন।
➡️ এই পুঁথিতে লাড়ী ডোম্বীপার কোন পদ পাওয়া যায় নি তাই তাকে চর্যাপদের নামে মাত্র কবি বলা হয়।

➡️একমাত্র অনুমিত মহিলা কবি বলা হয় কুক্কুরীপাকে।

⏺️চর্যাপদে কবির সংখ্যাঃ

⏺️চর্যাপদে মোট ২৪জন কবি পাওয়া যায়
➡️১ জন কবির পদ পাওয়া যায়নি তার নাম – তন্ত্রীপা / তেনতরীপা
➡️সেই হিসেবে পদ প্রাপ্ত কবির মোট সংখ্যা ২৩ জন

⏺️উল্লেখযোগ্য কবিঃ
১. লুইপা ২. কাহ্নপা ৩. ভুসুকপা ৪. সরহপা ৫. শবরীপা ৬. লাড়ীডোম্বীপা ৭. বিরূপা
৮. কুম্বলাম্বরপা ৯. ঢেন্ডনপা ১০. কুক্কুরীপা ১১. কঙ্ককপা

➡️কবিদের নাম শেষে পা দেওয়ার কারণঃ
পদ > পাদ > পা
পাদ > পদ > পা
পদ রচনা করেন যিনি তাদেরকে পদকর্তা বলা হত যার অর্থ সিদ্ধাচার্য / সাধক [এরা বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মের সাধক ছিলেন]

➡️২ টি কারণে নাম শেষে পা দেওয়া হতঃ
১. পদ রচনা করতেন
২. সম্মান / গৌরবসূচক কারনে

➡️লুইপাঃ
১. চর্যাপদের আদিকবি
২. রচিত পদের সংখ্যা ২ টি

➡️কাহ্নপাঃ
১. কাহ্নপার রচিত মোট পদের সংখ্যা ১৩ টি –তিনি সবচেয়ে বেশী পদ রচয়ীতা
২. উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে ১২ টি
৩. তার রচিত ২৪ নং পদটি পাওয়া যায়নি

➡️ভুসুকপাঃ
১. পদসংখ্যার রচনার দিক দিয়ে ২য়
২. রচিত পদের সংখ্যা ৮টি
৩. তিনি নিজেকে বাঙ্গালী কবি বলে দাবী করেছেন
৪. তার বিখ্যাত কাব্যঃ অপনা মাংসে হরিণা বৈরী অর্থ – হরিণ নিজেই নিজের শত্রু

➡️সরহপাঃ
১. রচিত পদের সংখ্যা ৪ টি

➡️শবরীপাঃ
১. রচিত পদের সংখ্যা ২ টি
২. গবেষকগণ তাকে বাঙ্গালী কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন
৩. বাংলার অঞ্চলে ভাগীরথী নদীর তীরে বসবাস করতেন বলে ধারণা করা হয়। যদি তিনি ভাগীরথী নদীর তীরে বসবাস না করতেন তাহলে বাঙ্গালী কবি হবেন না।

➡️কুক্কুরীপাঃ
১. রচিত পদের সংখ্যা ২ টি
২. তার রচনায় মেয়েলী ভাব থাকার কারণে গবেষকগণ তাকে মহিলা কবি হিসেবে সনাক্ত করেন।

➡️তন্ত্রীপাঃ
১. উনার রচিত পদটি পাওয়া যায় নি।
২. উনার রচিত পদটি ২৫ নং পদ।

➡️ঢেন্ডনপাঃ
চর্যাপদে আছে যে বেদে দলের কথা, ঘাঁটের কথা, মাদল বাজিয়ে বিয়ে করতে যাবার উৎসব, নব বধুর নাকের নথ ও কানের দুল চোরের চুরি করার কথা সর্বোপরি ভাতের অভাবের কথা
ঢেন্ডনপা রচিত পদে তৎকালীন সমাজপদ রচিত হয়েছে। তিনি পেশায় তাঁতি
টালত মোর ঘর নাই পড়বেশী
হাঁড়িতে ভাত নাই নিতি আবেশী

[আবেশী কথাটার ২টি অর্থ রয়েছে
ক্ল্যাসিক অর্থে – উপোস এবং রোমান্টিক অর্থে – বন্ধু]

⏺️চর্যাপদের ভাষাঃ
চর্যাপদের ভাষা বাংলা কি-না সে বিষয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল পরবর্তীতে যার অবসান হয়েছে। এটি বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। চর্যাপদের রচয়িতা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ সংস্কৃতে পারদর্শী হলেও তাঁরা তৎকালীন অপরিণত বাংলাতেই পদগুলি রচনা করেছিলেন।

➡️চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার  অদ্যাবধি আবিষ্কৃত আদিতম রূপ।

➡️ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর “Origin and Development of the Bengali language” (ODBL) _ গ্রন্থে বলেছেন__ “বাংলা নিশ্চয়ই,বাংলার মূর্তি অবহটঠের সদ্যোনির্মোক মুক্ত রূপ”।

➡️তবে ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহ চর্যার ভাষাকে প্রাচীন বাংলা কিংবা প্রাচীন বঙ্গকামরুপী ভাষা বলাই সঙ্গত মনে করেন।

➡️ম্যাক্সমুলারের মতে “চর্যাপদের ভাষা হলো প্রচ্ছন্ন ভাষা”। নির্দিষ্ট কোন রুপ নাই বিধায় অনেকে চর্যার ভাষাকে সান্ধ্যাভাষা বা আলো আধারির ভাষা বলেছেন।

➡️চর্যাপদ শুধু প্রাচীন বাংলা সাহিত্যেরই নিদর্শন নয়, প্রাচীন বাংলা গানেরও নিদর্শন। প্রতিটি পদের শুরুতে রাগ-তাল ও প্রতি জোড়-পদে ‘ধ্রুব’ শব্দের উল্লেখ থাকায় নিশ্চিত প্রমাণিত হয় যে, এগুলি তখন গাওয়া হতো। এ ছাড়া পদগুলি থেকে তৎকালীন বাঙালি জীবনের আচার-আচরণ ও সমাজের বাস্তবঘন পরিচয়ও পাওয়া যায়।
যেমন তখনকার মানুষ হরিণ শিকার, নৌকা চালনা, চেঙারি তৈরি, শুঁড়ির কাজ ইত্যাদি করত। কাড়া-নাকাড়া ও ঢাক-ঢোল বাজিয়ে বর-কনেকে বিয়ের আসরে নিয়ে যাওয়া হতো। সমাজে যৌতুক প্রথা প্রচলিত ছিল। গরু ছিল গৃহপালিত পশু; হাতিরও উল্লেখ আছে। মেয়েরা পরিধানে ময়ূরপুচ্ছ, গলায় গুঞ্জার মালা এবং কর্ণে কুন্ডল পরত। টাঙ্গি, কুঠার, নখলি বা খন্তা ছিল উল্লেখযোগ্য অস্ত্র। তবে সমকালীন সমাজের এসব চিত্র অঙ্কন করলেও চর্যাকারেরা প্রধানত ছিলেন বৈরাগ্যপন্থি, জগৎমুখী নন।

➡️ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, প্রাচীনতম চর্যাকার শবরপা এবং আধুনিকতম চর্যাকার সরহ বা ভুসুকুপা।

➡️কাহ্নপা সর্বাধিক ১৩টি পদ রচনা করেন

➡️দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ লেখেন-ভুসুকুপা: ৮টি।

➡️শবরপাকে চর্যাপদের বাঙালি কবি মনে করা হয়

➡️চর্যাপদ মাত্রাবিত্ত ছন্দে রচিত

➡️চর্যাপদ গ্রন্থে মোট কয়টি পদ পাওয়া গেছে-সাড়ে ছেচল্লিশটি (একটি পদের ছেঁড়া বা খন্ডিত অংশসহ)।

➡️চর্যার পদগুলো সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষায় রচিত।

➡️সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা-যে ভাষা সুনির্দিষ্ট রূপ পায় নি, যে ভাষার অর্থও একাধিক অর্থাৎ আলো-আঁধারের মত,সে ভাষাকে পন্ডিতগণ সন্ধ্যা বা সান্ধ্যভাষা বলেছেন।

➡️চর্যাপদ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত প্রথম পদটি লেখা-লুইপার।

➡️ চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

➡️নেপালের রয়েল লাইব্রেরি থেকে, ১৯০৭সালে চর্যাপদ আবিষ্কার করা হয়।

➡️১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে চর্যাপদ আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদনা করেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

➡️ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ৬৫০খ্রিস্টাব্দ থেকে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে  ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পদগুলো রচিত। সুকুমার সেন সহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব পন্ডিতই সুনীতিকুমারকে সমর্থন করেন।

➡️চর্যাপদের নাম নিয়ে প্রস্তাবগুলো -কারো মতে গ্রন্থটির নাম, ‘আশ্চর্যচর্যাচয়’, সুকুমার সেনের মতে ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়, আধুনিক পন্ডিতদের মতে এর নাম ‘চর্যাগীতিকোষ’ আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ‘চর্য্যার্চয্যবিনিশ্চয়’।

➡️তবে ‘চর্যাপদ’ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নাম।

➡️চর্যার কবিদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বলে মনে করা হয়-শবরপা (৬৮০ থেকে ৭৬০ খ্রিস্টাব্দ)।

➡️চর্যাপদের সর্বাধিক পদরচয়িতা -কাহ্নপা।
চর্যাপদে যে পদগুলো পাওয়া যায় নি তার মধ্যে কাহ্নপার রচনা বলে মনে করা হয়-২৪ নং পদটি।

➡️ চর্যাপদে কাহ্নপা আর কি কি নাম পাওয়া যায়-কাহ্নু, কাহ্নি, কাহ্নিল, কৃষ্ণচর্য,কৃষ্ণবজ্রপাদ।

➡️অনেকের মতে কুক্কুরীপা নারী ছিলেন।

➡️কুক্কুরীপা রচিত অতিপরিচিত দুটি পংক্তি -দিবসহি বহূড়ী কাউহি ডর ভাই।রাতি ভইলে কামরু জাই। (পদ:২) (অর্থাৎদিনে বউটি কাকের ভয়ে ভীত হয় কিন্তু রাত হলেইসে কামরূপ যায়।)

➡️লুইপা  ছিলেন-প্রবীণ বৌদ্ধসিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদেরকবি।

➡️ শবরপা -তার জীবনকাল ৬৮০ থেকে ৭৬০খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। সেই সূত্রে শবরপা চর্যারকবিদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। মুহুম্মদ শহীদুল্লাহর মতে তিনি ‘বাংলা দেশে’র লোক।

➡️তিববতী ঐতিহাসিক লামা তারনাথের মতে লুইপা পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার ধারে বাস করতেন। ➡️হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে লুইপা রাঢ়অঞ্চলের লোক।

➡️শবরপা গুরু ছিলেন-লুইপার।

➡️চর্যাপদের প্রথম পদটি রচনা লুইপার।
কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।চঞ্চল চীএ পৈঠা কাল\ (পদ: ১) ( অর্থাৎ দেহগাছের মত, এর পাঁচটি ডাল। চঞ্চল মনে কালপ্রবেশ করে।)

➡️লুইপা রচিত সংস্কৃতগ্রন্থের নাম পাওয়া যায়, – ৫টি। অভিসময় বিভঙ্গ, বজ্রস্বত্ব সাধন, বুদ্ধোদয়, ভগবদাভসার, তত্ত্ব সভাব।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন 

প্রশ্ন: বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন কি?
উঃ চর্যাপদ

প্রশ্ন: চর্যাপদ’ শব্দটির অর্থ কি?
উঃ জীবন যাপনের পদ্ধতিকে চর্যা বলে। চর্যা থেকে বর্তমানে ‘চর্চা” শব্দটির উৎপত্তি। পদ’ অর্থ চরণ বা পা। ‘চর্যাপদ’ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় জীবন যাপনের পদ্ধতি বা আচরণ যে কবিতায় বা চরণে লিখিত থাকে অর্থাৎ ‘চর্যাপদ-এর মূল অর্থ হলাে কোনটি আচরণীয়, কোনটি আচরণীয় নয়।

প্রশ্ন: চর্যাপদের প্রকৃত নাম কী?
উঃ চর্যাচর্যবিনিশ্চয়।

প্রশ্ন: চর্যাপদকে সংক্ষেপে কী বলা হয়?
উঃ বৌদ্ধগান ও দোহা’ বা ‘চর্যাপদ।

প্রশ্ন: “চর্যাপদ মূলত কী ধরনের গ্রন্থ?
উঃ কবিতা সংকলন বা গানের সংকলন।

প্রশ্নঃ চর্যাপদের রচয়িতা কারা?
উঃ বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ/বৌদ্ধ সহজিয়াগণ।

প্রশ্নঃ চর্যাপদ মূলত কোন ধর্ম নিয়ে রচিত?
উঃ বৌদ্ধ ধর্ম।

প্রশ্ন: কোন আমলে চযাপদ রচিত হয়েছে?
উঃ পাল রাজাদের আমলে।

প্রশ্ন: চর্যাপদ রচনায় কারা পৃষ্টপােষকতা করেছেন?
উঃ পাল রাজারা।

প্রশ্ন: চর্যাপদ কোন প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপােষকতায় পুনরুদ্ধার করা হয়েছে?
উঃ বঙ্গীয় সাহিত্যে পরিষদ।

প্রশ্ন: চর্যাপদের আবিষ্কারক কে?
উঃ মহামহােপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

প্রশ্ন: কোন স্থান থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করা হয়?
উঃ নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থশালা/নেপালের রয়েল লাইব্রেরি।

প্রশ্ন: চর্যাপদ কত সালে আবিষ্কৃত হয়?
উঃ ১৯০৭ সালে (১৩১৪ বঙ্গাব্দে)।

প্রশ্ন: চর্যাপদ কত সালে প্রকাশিত হয়?
উঃ ১৯১৬ সালে (১৩২৩ বঙ্গাব্দে) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে।

প্রশ্ন: চর্যাপদের মােট পদ সংখ্যা কত?
উঃ ৫১ টি।

প্রশ্নঃ চর্যাপদের আবিষ্কৃত পদ সংখ্যা কত?
উঃ সাড়ে ছেচল্লিশটি।

প্রশ্ন: চর্যাপদ কোন ছন্দে রচিত
উঃ মাত্রাবৃত্ত।

প্রশ্ন: চর্যাপদের ভাষা কী?
উঃ সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা ।

প্রশ্ন: কোন সাহিত্য কর্মে সান্ধ্যভাষার প্রয়ােগ আছে?
উঃ চর্যাপদ। ( ‘ব্রজবুলি ভাষার প্রয়ােগ ঘটেছে বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যে।)

প্রশ্ন: চর্যাপদের কবির সংখ্যা/পদকর্তা কতজন?
উঃ ২৩ জন। (চর্যাপদের খণ্ডিত আকারে প্রাপ্ত পদটিও ২৩ নং)

প্রশ্ন: চর্যাপদের আদি কবি কে?
উঃ লুইপা (তিনি চর্যাপদের প্রথম পদটি রচনা করেছেন বলে তাঁকে আদি কবি বলা হয়।)

প্রশ্ন: চর্যাপদের সর্বাধিক পদ রচয়িতা কে?

উঃ কাহপা (১৩টি)।

➡️সংকলন-মোস্তাফিজার মোস্তাক

Check Also

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত উক্তি ও প্রবক্তা

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত উক্তি ও প্রবক্তা 📒রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১। ‘আজি হতে শত বর্ষে পরে কে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *